Select Page
২০২৩-০৭-১৫
নারীপক্ষ’র ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে “তরুণ নারী সম্মেলন”

মোরা আকাশের মত বাধাহীন
নারীপক্ষ’র ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে

২৯-৩১ আষাঢ় ১৪৩০/ ১৩-১৫ জুলাই ২০২৩ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, সাভারে নারীপক্ষ’র আয়োজনে ৩ দিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলন হয়। এই তরুণ নারী সম্মেলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে- টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ এর আলোকে নারীর অবস্থা ও অবস্থান পরিবর্তনে তরুণ নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং তরুণ নারীদের অংশগ্রহণে নারী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃতকরণ।

এই সম্মেলনে সারাদেশ থেকে ২০০ জন তরুণ নারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৩০০ জন নারী অধিকার কর্মী অংশগ্রহণ করেছেন। সম্মেলনের প্রথম দিন বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই তরুণ সম্মেলনের সূচনা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের ১ম পর্বে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন নারীপক্ষ’র সভানেত্রী ড. তাসনিম আজীম। অতঃপর, সংগ্রামী নারীর জীবনের কথা অধিবেশনে নিজেদের জীবন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন-

জমিলা খাতুন, বাংলাদেশের প্রথম নারী বয়লার অপারেটর, গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যালস লিমিটেড, টঙ্গী। তিনি বলেন ডা. জাফজুল্লাহ চৌধুরীর উৎসাহ এবং সহযোগিতায় তিনি এশিয়া মহাদেশের সর্বপ্রথম লাইসেন্সধারী নারী বয়লার অপারেটর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

হাজেরা খাতুন, প্রতিষ্ঠাতা, শিশুদের জন্য আমরা বিদ্যালয়। পথশিশু হিসেবে ভিক্ষাবৃতি, চুরি, টোকাই হওয়া দিয়ে জীবন সংগ্রাম শুরু। পরবর্তীতে যৌনকর্মী হিসেবে জীবন চালিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে নারীপক্ষ, কেয়ার বাংলাদেশ, কনসার্ণ এদেও সহযোগিতায় তিনি তার পেশাগত পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। তিনি বলেন, “নারীপক্ষ’র সাথে কাজ করেই আমি বুঝতে পেরেছি যে আমরাও মানুষ, আমাদেরও বাঁচার অধিকার আছে”। উল্লেখ্য যে, ২০১০ থেকে তিনি যৌনকর্মীদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য ‘শিশুদেও জন্য আমরা বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন।

সোমা আক্তার, উদ্যোক্তা, “ফুড বক্স বাই সোমা” ও সভাপতি বেসিক ইউনিয়ন। তিনি বলেন, নারীদের পথ চলা অনেক কঠিন, প্রতিবাদ করলেই শুনতে হয় খারাপ মেয়ে, খারাপ নারী। তারপরেও প্রতিবাদ করতে হবে, নিজেকে নিজেই বাঁচাতে হবে, নিজের অধিকার নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। তিনি গার্মেন্টস কর্মী থেকে এখন সফল নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন এবং পাশা পাশি শ্রমিক রাজনীতিও করছেন।

অনুষ্ঠানের ২য় পর্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ড. সামিনা লুৎফা, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও ক্রিয়েটিভ ডাইরেক্টর, বটতলা এ পারফরমেন্স স্পেস।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- রাশেদা কে. চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও সাবেক উপদেষ্টা তত্ত¡াবধায়ক সরকার, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

সভাপ্রধান হিসেবে নারীপক্ষ’র সভানেত্রী ড. তাসনিম আজীম আগামী ৩তিন সকলকে প্রত্যেক অধিবেশনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহবান জানান।
অতিথিদের বক্তব্য শেষে “মুক্ত পাখি গানের দল” এর পরিবেশনায় বাউল সঙ্গীত উপস্থাপনের মধ্য নিয়ে ৩ দিন ব্যাপী সম্মেলনের ১ম দিন সমাপ্ত হয়।
২৯ আষাঢ় ১৪৩০/ ১৩ জুলাই ২০২৩ সম্মেলনের ২য় দিন, সকাল ৯.০০ টায় সবাইকে নিয়ে মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচী শুরু হয়। আলোচনার বিষয় ছিল- নারী আন্দোলনে প্রবীণ থেকে নবীন নেতৃত্ব। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন জাহানারা খাতুন, সদস্য, নারীপক্ষ। এই অধিবেশনে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন-

মাহবুবা মাহমুদ লীনা, সদস্য, নারীপক্ষ। তিনি তার বক্তব্যে সেই ১৯৮৩ সাল থেকে নারীপক্ষ’র সাথে তাঁর পথ চলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, প্রতিটা সংগ্রামী নারী এক একটা প্রদীপ, প্রদীপ গুলো দূরে দূরে থেকে জ্বললে সমাজের অন্ধকার দূর করা সম্ভব নয়, এই সবগুলো প্রদীপকে একজায়গায় এনে সমাজকে আলোকিত করার লক্ষ্য নিয়েই নারীপক্ষ তাঁর যাত্রা শুরু করেছে এবং অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে।

স্বাতিল মাহমুদ, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, স্বয়ং। তিনি বলেন, ” নারীদের না বলা গল্পগুলো তুলে আনার লক্ষ্য নিয়েই স্বয়ং এর যাত্রা শুরু ২০২০ সাল থেকে। নারীপক্ষ’র ‘শরীর আমার সিদ্ধান্ত আমার’ আন্দোলনের সাথে মেলবন্ধন রেখে আমরাও “শরীর যার, সিদ্ধান্ত তাঁর” ¯েøাগান নিয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছি।
ময়ূরী আক্তার টুম্পা, প্রতিনিধি, তারুণ্যের কণ্ঠস্বর, বরিশাল। তিনি একজন তরুণ নারী নেত্রী হিসেবে নারীপক্ষ’র প্রকল্প অধিকার এখানে, এখনই প্রকল্পের মাধ্যমে বরিশাল জেলায় কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।

আলোচকদের বক্তব্য শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে মুক্ত আলোচনা করা হয়।

এরপর, ১১:৩০ মিনিট থেকে ১:৩০ মিনিট পর্যন্ত ৫ টি বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। নারীপক্ষ’র অভিজ্ঞ সদস্য ও কর্মীগণ এই সকল কর্মশালা সঞ্চালনা করেন। কর্মশালার বিষয়গুলো হল-

১. সহিংসতা মুক্ত নারীর জীবন
২. নারীর স্বাস্থ্য ও অধিকার
৩. নারীর অর্থনৈতিক অধিকার
৪. পরিবেশ ও নারী
৫. সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি

কর্মশালায় দলীয় কাজের মাধ্যমে প্রত্যেক বিষয়ে কিছু সুপারিশ উঠে আসে, এই সুপারিশ গুলো বড় দলে আলোচনার মাধ্যমে নারীপক্ষ ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করবে

মধ্যাহ্ন বিরতির পর ৩:০০ টা থেকে সকলকে নিয়ে “প্রযুক্তি ও নারী” বিষয়ে মুক্ত আলোচনার অধিবেশন শুরু হয়।

ড. নাফিসা নূর, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয়। তিনি একটি উপস্থাপনার মাধ্যমে সাইবার হয়রানী প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় গুলো সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং সাইবার হয়রানীর স্বীকার হলে কি কি পদক্ষেপ নিতে হবে সেই সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেন।
আয়েশা আখতার উর্ধ্বতন এডভোকেসি কর্মকর্তা, বøাস্ট ও এডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি সাইবার ক্রাইমের ক্ষেত্রে আইনগত কি কি নীতিমালা আছে এবং কিভাবে আইনী সহায়তা পাওয়া যায় সেই বিষয়ে আলোচনা করেন।

সুরঞ্জনা সাহা সহকারী কমিশনার, সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। তিনি তাঁর বক্তব্যে সাইবার ক্রাইম মোকাবেলায় সরকারের কি কি ব্যবস্থা রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেন।

আলোচকদের বক্তব্য শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে মুক্ত আলোচনা করা হয়। মুক্ত আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের ২য় দিনের কর্মসূচী সমাপ্ত হয়।

সম্মেলনের ৩য় দিন, সকাল ৯.০০ টায় সবাইকে নিয়ে মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচী শুরু হয়। আলোচনার বিষয় ছিল- ৭১‘এর যে নারীদের ভুলেছি এবং যুদ্ধ সন্তান। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন নূরে মাকসুরাত সেঁজুতি, সদস্য, নারীপক্ষ।

এই অধিবেশনে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন- ড. ফিরদৌস আজীম, সদস্য, নারীপক্ষ – তিনি তাঁর বক্তব্যে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ সন্তানদের নিয়ে নারীপক্ষ’র উদ্যোগ সমূহ তুলে ধরেন।

গত দিনের বিষয়ভিত্তিক কর্মশালার সুপারিশমালা পর্যালোচনা এবং চুড়ান্তকরণ অধিবেশন পরিচালনা করা হয়। অধিবেশনটি সঞ্ছালনা করেন, ফেরদৌসী আখতার ও রীনা রায়, সদস্য, নারীপক্ষ।

মধ্যাহ্ন বিরতির পর সমাপনি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনটি সঞ্ছালনা করেন রেহানা সামদানী, সদস্য, নারীপক্ষ। অধিবেশনের শুরুতে সম্মেলনের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন গীতা দাস, সদস্য, নারীপক্ষ। এরপর ৫ জন তরুণ বিষয়ভিত্তিক কর্মশালার চূড়ান্ত সুপারিশসমূহ অতিথিদের সামনে উপস্থাপন করেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- ডাঃ নায়লা জামান খান, নিউরোলজিস্ট, বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা শিশু হাসপাতাল (১৯৯২-২০১৮)।
আফরোজা সোমা, কবি, প্রাবন্ধিক ও নারীবাদী গবেষক তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমাদের সকলকে কথা বলতে হবে, নিজের কথা নিজের বয়ানে তুলে ধরার যে শক্তি তাকে পৃথিবী ভয় পায়।

ব্যারিস্টার রাশনা ঈমাম, সুপ্রীম কোর্ট, বাংলাদেশ তাঁর বক্তব্যে কর্মশালার সুপারিশ গুলোর সাথে আরও কিছু সুপারিশ যুক্ত করেন।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভী, মাননীয় মেয়র, সিটি করপোরেশন নারায়নগঞ্জ। তিনি বলেন, নারীরা পরিবার সমাজ সকল ক্ষেত্রেই নানাবিধ বাধার সম্মখীন হয়। নিজে অধিকার আদায়ে সাহস নিয়ে কথা বলুন, যে নারীর সাহস আছে সে নারী এগিয়ে যেতে পেরেছে। নারীর এগিয়ে চলায় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। নিজের কন্যা সন্তানকে জমি/সম্পত্তি না দিয়ে তাকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করতে হবে। উপস্থিত তরুন নারী নেত্রীদের উদ্দেশ্য কে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম নিজের শক্তি সম্পর্কে জানতে হবে, বুঝতে হবে, নিজেকে পাল্পাতে পারলে সমাজকে পাল্টানো সম্ভব।

পরিশেষে সভাপ্রধান ড. ফিরদৌস আজীম, সদস্য, নারীপক্ষ সমাপনি বক্তব্য রাখেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কামরুন নাহার, সদস্য, নারীপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে তরুণ নারী সম্মেলনের সমাপ্তি হয়।

Pin It on Pinterest

Share This