Select Page
২০২৫-১১-১৯
নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার কর্মী, নারীপক্ষ’র প্রয়াত সদস্য নাসরীন হক এর জন্মতিথী
০৩ অগ্রহায়ণ/১৮ নভেম্বর নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার কর্মী, নারীপক্ষ’র প্রয়াত সদস্য নাসরীন হক এর জন্মতিথী। এই উপলক্ষ্যে নারীপক্ষ’র আয়োজনে ১৮ নভেম্বর ২০২৫ সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় আন্তর্জালে “অধিকারকে বাস্তবে রূপ দেয়া : নারী, আইন ও উন্নয়ন আন্দোলনের যাত্রাপথ” শীর্ষক ‘নাসরীন হক স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠিত হয়। এবারের বক্তা ছিলেন মার্গারেট শুলার, প্রতিষ্ঠাতা নারী, আইন ও উন্নয়ন  আন্দোলন। স্মারক বক্তৃতা সম্পর্কিত স্বাগত বক্তব্য এবং বক্তাকে আহবান জানান ফিরদৌস আজীম – নির্বাহী সদস্য ও প্রাক্তন সভানেত্রী, নারীপক্ষ।
Making rights Real হল সেই দীর্ঘ পথচলার বিবরণ, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের নারী-এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান এবং প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের নারীরা- আইনকে তাঁদের বাস্তব জীবনে কার্যকর করতে সংগ্রাম করেছেন।”
মার্গারেট শুলার উল্লেখ করেন যে, ১৯৮৫ সালে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত Third World Forum on Women, Law and Development-এর মাধ্যমে যে আন্তর্জাতিক সংলাপ শুরু হয়, তারই ধারাবাহিকতায় নারীর অধিকার আন্দোলন বিশ্বব্যাপী নতুন গতি পায়। গত ৩৫ বছরে  Women, Law and Development (WLD) বৈশ্বিক নারী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অধিকার-ভিত্তিক এজেন্ডা নির্ধারণ, আইন–সংস্কার, বৈষম্যমূলক কাঠামো চ্যালেঞ্জ করা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নিহিত দমনমূলক অনুশীলনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভ‚মিকা পালন করেছে।
বক্তা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক–রাজনৈতিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও নারীর দৈনন্দিন বাস্তবতা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই নারীর মানবাধিকারকে একটি অবিভাজ্য, আন্তনির্ভর ও অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কাঠামো হিসেবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীরা শ্রমক্ষেত্রে বৈষম্য, অনিরাপদ পরিবেশ, প্রজনন অধিকার লঙ্ঘন এবং ধর্ম–সংস্কৃতির নামে আরোপিত নিয়ন্ত্রণের মুখোমুখি হন। নারী শরীর, যৌনতা ও প্রজননক্ষমতাকে কেন্দ্র করে যে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি চালু আছে, তা নারীর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন নারীর অভিজ্ঞতানির্ভর ব্যাখ্যা, যেখানে নারীর কণ্ঠই হবে নীতি ও পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি।

পরিশেষে মার্গারেট শুলার জোর দিয়ে বলেনÑ“আন্তর্জাতিক প্রোটোকল বা দুর্বল বৈশ্বিক অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করে নারীর অধিকার পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং স্থানীয় নারীদের নেতৃত্ব, সংগঠিত শক্তি ও তৃণমূল অভিজ্ঞতাকেই নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিতে হবে।”
প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনার সময় নারীপক্ষ’র সভানেত্রী গীতা দাস বলেন, পৃথিবী চে গুয়েভারা কে যেভাবে চিনে, মার্গারেট শূলার কেও নারী আন্দোলনের জন্য সেভাবেই চেনা উচিত এবং মার্গারেট শূলারের এই বক্তব্য সত্যিই অসংখ্য নারীকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। মোট ১৫০ জন অংশগ্রহণকারী এ আলোচনায় যুক্ত হন।

গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রবন্ধের সারমর্ম তুলে ধরে ভিনিতা মুখার্জী বলেন, নারীর অধিকার শুধু আইনগত ও রাজনৈতিক দাবি নয়Ñ৮০-৯০ দশকের দিকে আন্দোলন যেরকম একটি পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিল সেভাবে বর্তমান স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাগুলো ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ এবং উদ্বুদ্ধ হওয়া কতটুকু কার্যকরী বলে বক্তা মনে করেন।

দিনটি ছিল নারীপক্ষ’র অন্যতম সদস্য এবং নারী ও শিশু অধিকার কর্মী নাসরীন হকের জন্মদিন।মার্গারেট শূলার তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, নারী অধিকারের পক্ষে কাজ করার শুরুতে তিনি এরকম একজন মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে সত্যিই গর্বিত। নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে বক্তার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংস্কৃতি মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ হয়। যেখান থেকে তিনি জানতে পারেন যে নারীর সান্নিধ্য পেতে এবং তাকে জাগ্রত করতে অবশ্যই নারীর প্রতি সহানুভ‚তিশীল হতে হবে এবং এক্ষেত্রে বই পড়ার আবশ্যিকতা অপরিহার্য।
এ ধরনের স্মারক আলোচনা নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে, সংগ্রামের পথকে সুদৃঢ় করে এবং সমতার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।

নাসরীন হক যে সকল অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তা শুধুমাত্র নারী অধিকার আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন একটি সেতু রচনা করতে, যে সেতু জাতিতে-জাতিতে, ধনী-দরিদ্র, সমতল-পাহাড়ী, শহর-গ্রামীন সকল মানুষের মধ্যে তৈরী করবে গভীর মানবিক সম্পর্ক। তিনি সংগ্রাম করেছেন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মৌলিক অধিকার এবং নারী মুক্তির জন্য। সব ধরণের, সব শ্রেণীর, ভাষার, ধর্মের, সম্প্রদায়ের, জাতিসত্তার, যৌনপরিচিতির সর্বোপরি সামাজিক কোন পার্থক্যই তাঁর জন্য দেয়াল তৈরি করতে পারে নাই। সকলের দিকেই তিনি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতেন।
নারীপক্ষ মনে করে, নাসরীন হক স্মারক বক্তৃতার আয়োজন তাঁর স্বপ্ন এবং কর্মতৎপরতাকে ধরে রাখার একটি বিশেষ উপায়।

Pin It on Pinterest

Share This