আলোর স্মরণে কাটুক আঁধার- ২০১৬


মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মরণে ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছরের মতো এবারও বিজয় দিবসের প্রাক্কালে নারীপক্ষ আয়োজন করছে আলোর স্মরণে কাটুক আঁধার অনুষ্ঠান। এবারের প্রতিপাদ্য ধর্মীয়, জাতিগত এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাসহ সকল অধিকার সুরক্ষা করুন

ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস, আনন্দের মাস, বেদনার মাস। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি এবং বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত হয়েছে আমাদের স্বাধীন অবস্থান। এর জন্য আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, হারাতে হয়ছে অসংখ্য স্বজন। হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মরণ করতে প্রতিবছর আমরা এভাবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবতে হই।

স্বাধীনতার জন্য, মুক্তরি জন্য, নিজেদের অস্তিত্বের জন্য শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এদেশের মানুষ ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। স্বপ্ন ছিল মানুষে মানুষে বিভেদহীন ধর্মনিরপেক্ষ এক স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা, কিন্তু সেই প্রত্যাশতি স্বাধীন দেশ কি আমরা পয়েছে? ধর্মগত, ভাষাগত, জাতি-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়গতভাবে যাঁরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও সংখ্যায় কম বা প্রান্তিক অবস্থানে আছেন তাঁদের উপর প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন এবং মাঝে মাঝেই তা সহিংস আক্রমণে পরিণত হচ্ছে। তাঁদের মন্দির, উপাসনালয়ে হামলা ও ভাঙচুর, বাড়িঘর পোড়ানো, মালামাল লুটপাট, জায়গা-জমি ও সম্পত্তি দখল, নারীদের উপর ধর্ষণ ও যৌনআক্রমণ - এমনকি প্রাণে মেরে ফেলা! এর সাম্প্রতকি উদাহরণ নাসরিনগর, ঠাকুরগাঁও, যশোর, ফেনী, পিরোজপুর, দিনাজপুর,ও গোবন্দিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনা। নারীপক্ষ এই সকল ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। এইসব ঘটনার সাথে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং তাদের অপরাধ আড়াল করার চেষ্টায় আমরা আরো বেশী উদ্বিগ্ন। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ভূমি দস্যুদের দাপট, পুলিশ-প্রশাসনের মদত এবং দেশে আইনের শাসনের অভাব ও বিচারহীনতা এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির জন্য দায়ী।

নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, নির্বিশেষে বভিন্নি জনগোষ্ঠীর ত্যাগে র্অজতি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে, নিবিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে বসবাস করবে, নিজস্ব ধর্ম পালন করবে, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন, ধারণ ও বহন করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ধর্মীয়, জাতিগত এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাসহ সকল অধিকার সুরক্ষা করুন।

শোষণ-বৈষম্যহীন নির্যাতনমুক্ত জীবন আমাদের প্রত্যেকের অধিকার। এই অধিকার চর্চার জন্য প্রয়োজন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা; যাতে নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, নির্বিশেষে সকল জনগোষ্ঠীর প্রতিটি নাগরিক আইনের আশ্রয় লাভের সমান সুযোগ পায়। এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক দায়িত্ব সরকারের। আমাদের সজাগ থাকতে হবে এবং গড়ে তুলতে হবে সকল অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারার সমন্বিত প্রয়াস, যাতে সারকার তার এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে না পারে। মানুষে মানুষে সম্প্রীতির বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে একে অপরের পাশে দাঁড়াবার মানসিকতা তৈরি ও সামাজিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।

নারীপক্ষ আপনাকে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মরণে আয়োজিত আলোর স্মরণে কাটুক আঁধার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মোমবাতি জ্বালাবার আহ্বান জানাচ্ছে। আসুন, মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মরণে মোমবাতির আলো জ্বালিয়ে আমরা নিজেদের আলোকিত করি; প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই; গড়ে তুলি একটি মুক্তমনা, অসাম্প্রদায়িক এবং সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।


স্থান: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
দিন-ক্ষণ : শুক্রবার, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩/৯ ডিসেম্বর ২০১৬, বিকাল ৫:২০ থেকে সন্ধ্যা ৬:৩০

নারীপক্ষ
জিপিও বক্স-৭২৩, ঢাকা-১০০০, ওয়েব :
www.naripokkho.org.bd