লড়াইটা ভাষারও পোস্টার উন্মোচন

নারীপক্ষ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭/৫ ডিসেম্বর ২০২০ বেলা ১১:০০ টায় নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উপলক্ষে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে লড়াইটা ভাষারও বিষয়ক পোস্টার উন্মোচন করা হয়। নারীপক্ষর ভাষাগত চর্চা কেন করা হয় সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা হয় এবং ভাষা সংক্রান্ত নারীপক্ষর অবস্থান এই সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে নারীপক্ষর পক্ষ থেক ব্যাখ্যা করেন সদস্য কামরুন নাহার, সামিয়া আফরীন ও রওশন আরা। তাদের সাথে আরো যুক্ত হন নারীপক্ষর সদস্য গীতা দাস, মাহবুবা মাহমুদ, শিরীন হক, অমিতা দে ও ইউ. এম হাবিবুন নেসা। পোষ্টরটি ডিজাইন করার পিছনে ডিজাইনার তাসাফ্লী হোসেন তাঁর মনোভাবের কথা তুলে ধরেন। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে লড়াইটা ভাষারও বিষয়ক পোস্টার উন্মোচন করা হয়। নারীপক্ষর ভাষাগত চর্চা কেন করা হয় সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা হয় এবং নারীপক্ষর অবস্থান কি তা এই সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয় যা নিম্নরূপ:

নারীপক্ষ চায় যে আমরা এবং আপনারা, সবাই শব্দ ব্যবহারে আরো সচেতন হবো এবং বোঝার চেষ্টা করবো কেন কি ভাবে কোনো কোনো শব্দ অসম্মানজনক বা ক্ষতিকারক। আবার কোনো কোনো শব্দ সমস্যার মূল জায়গাকে আড়াল করে ।

 

১. 'পতিতা' শব্দ ব্যবহার না করে, 'যৌনকর্মী ' ব্যবহার করবো কারণ,

যারা যৌন সেবা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন পতিতা সম্বোধন করলে তাঁদের অসন্মান করা হয় এবং তাঁদের শ্রমকে অদৃশ্য করা হয় । যৌনকর্মী সম্বোধন যৌন কর্ম কে কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । পতিতা শব্দের মধ্যে পতিত হওয়া বুঝায় এবং এই শব্দটির সাথে অবশ্যম্ভাবি ভাবে অপরাধ এবং অনৈতিকতার এক ধরনের সম্পৃক্ততা রয়েছে । যৌন বৃত্তি ভাল কি মন্দ, বা শোষণ কি না সেই বিতর্কের অবতারণা করতে চাই না ।

 

নারীপক্ষ যুক্ত হয়েছিল যৌনকর্মী নারীদের মানবাধিকার রক্ষার্থে আন্দোলনের সাথে ১৯৯৯ সালে টানবাজার আর নিমতলীতে যৌনকর্মীদের কর্ম ও আবাস স্থল থেকে যখন তাঁদের নির্মম ভাবে উচ্ছেদ করা হয় । তার আগে ১৯৯২ সালে টানবাজারের যৌনকর্মীরা যখন উচ্ছেদের হুমকির মুখে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেরাই বলেন নারী হিসেবে, শ্রমিক হিসেবে এবং এই দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁদের অধিকারের কথা, তখনই নারীপক্ষ তাঁদের সাথে সংহতির সুত্র খুঁজে পায় । আমরা ছুটে যাই টানবাজারে, সংহতি প্রকাশ করি এবং তাঁদের সংগ্রামে পাশে থাকার অঙ্গীকার করি ।

 

পতিতা শব্দটির সাথে যে গৎবাঁধা ধারণা মিশে আছে আমরা সেই ধারণার অবসান চাই । সেই ধারণায় পতিতা সবসময়ই নারী এবং তাঁর খদ্দের সব সময়ই পুরুষ । পতিতা নারী নষ্টা নারী, বেশ্যা । তাঁর স্বতন্ত্র কোন ব্যক্তিত্ব নাই, সে পরাধীন, পরনির্ভরশীল । হয়তো বা বেশীর ভাগ যৌনকর্মীর ক্ষেত্রে সেইটাই বাস্তবতা, তাঁরা এক ধরণের বন্ধকি শ্রম ব্যবস্থায় আটক । তথাপি প্রতিটা মানুষই একটা স্বাধীন সত্ত্বার অধিকারী, হোক সে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক শেকলে বাঁধা।যদিও এই মানুষটি কোথাও থেকে পতিত হননি বা পড়ে যাননি, আমাদের চেতনায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পেশায় জড়িত মানুষটি খারাপ কাজ করে, তাই আমরা তাঁকে পতিতা সম্বোধন করি । ১৯৯৯ সালের সেই উত্তাল আন্দোলন চলা কালে বেশীর ভাগ সংবাদ মাধ্যমই পতিতা শব্দ বর্জন করে এবং যৌনকর্মী সম্বোধন চালু করে, তথাপি সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষ এখনও পতিতা শব্দই ব্যবহার করে থাকেন । এই চর্চার অবসান চায় নারীপক্ষ ।

 

২. ধর্ষিতা বা নির্যাতিতা নয়  ধর্ষণের শিকার বা নির্যাতনের শিকার সঠিক শব্দ চয়ন কারণ ধর্ষিতা বা নির্যাতিতা শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যে ধর্ষণ অপরাধের ভুক্তভোগী তাঁকে পরিচিত করা হয় এই অপরাধ দিয়ে । চুরির অপরাধে যেমন, যে চুরি করে তাকেই চোর বলা হয়, যার কিছু চুরি হয় তাঁকে চোর বলা হয় না । তাই ধর্ষণ যে করে তাকে ধর্ষক বা ধর্ষণকারী বলা যেতে পারে, কিন্ত যার উপর এই অপরাধ সংগঠিত হয় তাঁকে আলাদা কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করার কোন যুক্তি নাই । ধর্ষণ কোন নারীর নিজের আচরণ বা দূর্বলতা নয়, বরং এটি তার উপর সংঘটিত একটি ফৌজদারী অপরাধ । ধর্ষণের শিকার নারীকে এই বিশেষণ জীবনব্যাপী বহন করতে হয়, তাই ধর্ষিতা বা নির্যাতিতা সম্বোধন করে তাঁকে চিরতরে এই ঘৃণ্য অপরাধের সাথে যুক্ত করা মোটেও ন্যায় সংগত না। তেমনি ধর্ষণের কারণ হিসেবে ধর্ষণের শিকার নারীকে দোষারোপ করাটাও অন্যায়।

 

আবার নির্যাতিতা বিশেষণ একজন মানুষকে অত্যন্ত দলিত মথিত ভাবে উপস্থাপন করে। এই শব্দগুলো ব্যবহার করে  ধর্ষণের শিকারনির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে আরো নিষ্পেশিত করা হয় । এই শব্দ নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে মানসিকভাবেশারিরীকভাবে এবং সামাজিকভাবে দূর্বল করে দেয়, তাঁকে ঘুরে দাড়াতে সাহায্য করে না ।

 

এই শব্দদ্য় ব্যবহার করার একটি বড় কারণ, নারীর শরীরের সাথে তার সম্মান এবং ইজ্জতকে এক করে ভাবা ও দেখার মানসিকতা। নারীপক্ষ নারীর শরীরকেন্দ্রিক, বিশেষত তার যৌনাঙ্গ কেন্দ্রীক ইজ্জতের ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গীর অবসান চায় ।

 

তাই আমরা আপত্তি জানাই যখন বক্তৃতা দেয়ার সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অভ্যাসগত ভাবেই ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যে নারীরা পাক বাহিনীর যৌন আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন তাঁদের সম্পর্কে বলেন, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা এর কথা। ইজ্জত কারও গেলে তা ধর্ষণকারীর গেছে । এখন ডিসেম্বর মাস, বিজয়ের মাস, বেতার ও টেলিভিশনে প্রায়শই শুনতে হবে এই অপমানজনক সম্ভাষণ। আমরা এই নারীদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছিলাম তাঁদের সন্মান যেন অটুট থাকে, কিন্ত হিতে বিপরীত সেই উপাধিই দ্রুত পরিণত হলো গালিতে । এই প্রসঙ্গে আমাদের দাবী বীরাঙ্গনা উপাধির সন্মান পুনরুদ্ধার করা হোক এবং ভবিষ্যতে আর কোন ধর্ষণের শিকার নারীকে ধর্ষিতা না বলা, আর কোন নির্যাতনের শিকার নারীকে নির্যাতিতা না বলা।

 

৩. 'এসিড দগ্ধ' না বলে, 'এসিড আক্রমনের শিকার' বলবো, কারণ  

এসিডদ্বগ্ধ বললে এসিড দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির শারিরিক ক্ষতকেই বুঝায়, এই ঘটনা যে একটা অপরাধ সেই ব্যাপারটাই উহ্য হয়ে যায় ।

এসিডকে যে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার প্রকাশ ঘটেনা । তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ এই যে এসিড আক্রমণের শিকার সবাই দগ্ধ হন না । অনেক সময় এসিড যাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়, তার শরীরে গিয়ে নাও লাগতে পারে । একটা মানুষ দগ্ধ হতে পারে নানান পরিস্থিতে নানান কারণে ।

 

কিন্তু আক্রমনের মধ্যে অপরাধ আছে। কাউকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে এসিডকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা ফৌজদারি অপরাধ । কেউ একজন সুচিন্তিত ভাবে এই অপরাধ সংগঠিত করেছে । উপরোন্ত এসিড আক্রমণের শিকার ব্যক্তিকে এসিডদ্বগ্ধ বললে তাকেও একটি বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। আবারও অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে বিশেষ নামে চিহ্নিত করা হয় এবং এই সম্বোধন সেই মানুষটিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে না। 

 

৪। 'গণধর্ষণ' নয় 'সংঘবদ্ধ ধর্ষণ' বলাই সমুচিত

 

গণ শব্দটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিভাষা, এটি একটি ইতিবাচক শব্দ।

যেমন-গণপরিসর, গণশিক্ষা, গণপরিবহন ইত্যাদি । এই শব্দটি কোন অপরাধের সাথে যুক্ত করে ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় নয় । ধর্ষণ এর সাথে যখন একের অধিক লোক যুক্ত থাকে তখন একে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বলাটাই সমুচিত। যেহেতু ঘটনাটি পূব পরিকল্পিত সেহেতু সংঘবদ্ধ শব্দটি যথাথ।  

 

কোন শব্দ বা ভাষা প্রয়োগের সাথে বিষয়টি বা ঘটনার সাথে এর সংশ্লিষ্ট পরিস্থতি ব্যাখ্যা করে 

এবং এর সাথে মর্যাদার বিষয়টি ও জড়িত। তাই ভাষা প্রয়োগে এবং ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। আর এই লড়াইয়ে আপনারাই আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহায়তা করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস ।