ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল: নারীপক্ষর স্বপ্ন ও ৩৫ বছরের পথচলা

২৭-২৮ আশ্বিন ১৪২৫/১২-১৩ অক্টোবর ২০১৮ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল: নারীপক্ষর স্বপ্ন ও ৩৫ বছরের পথচলা শিরোনামে নারীপক্ষর দুইদিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বন্ধনহীন জন্ম স্বাধীন চিত্তমুক্ত শতদল- নারীমুক্তি আন্দোলন ও নারীপক্ষর ভাবনা বিষয়ক আলোচনা নিয়ে দিনের প্রথম অধিবেশন। অধিবেশনটি শুরু হয় মোরা ঝঞ্ঝার মতো ইদ্যাম.... গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।

পর্বটি সঞ্চালনা করেন নারীপক্ষর সদস্য ও প্রক্তন সভানেত্রী রীনা রায়। তিনি বলেন, নারীপক্ষ নিজে একটি চিত্তমুক্ত শতদল এবং নারীপক্ষর চেন্তা-চেতনাকে ধারণ করে সারা বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গায় যারা কাজ করছে তারাও এক একটি মুক্ত শতদল। এই পর্বে মূল আলোচক ছিলেন, নারীপক্ষর নির্বাহী সদস্য ও প্রক্তন সভানেত্রী ফিরদৌস আজীম, নির্বাহী সদস্য ও প্রক্তন সভানেত্রী শিরীন হক এবং সদস্য মাহবুবা মাহমুদ লীনা।

বিশ^ব্যাপী নারী আন্দোলন, মানবতার আন্দোলন ও স্বাধীনতার আন্দোলনে নারীরা কিভাবে যুক্ত হয়েছিল সে বিষয়ে আলোচনা করেন ফিরদৌস আজীম। নারীপক্ষর চিন্তাভাবনা ও বিভিন্ন আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করেন শিরীন হক। নারীপক্ষর চিন্তাভাবনা ও আন্দোলনকে সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কিভাবে দুর্বার নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন জোট/মঞ্চ/মোর্চা গঠন করা হয় সে সম্পর্কে আলোচনা করেন মাহবুবা মাহমুদ লীনা।

ফিরদৌস আজীম তার আলোচনায় ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণের ইতহাস তুলে ধরে বলেন, ফরাসি বিপ্লব বিশ^ব্যাপী একটি প্রেরণা যুগিয়েছিল মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার। এই বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা ছিল খুবই চোখে পড়ার মতো কিন্তু বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরে দেখা গেল, অন্যান্য ক্ষেত্রে বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও দুঃখজনকভাবে নারীর মুক্তির বিষয়টি সেখানে উপেক্ষিত থেকে গেল। রুশ বিপ্লবের সময়ও নারীমুক্তির অনেকগুলো বিষয় যুক্ত ছিল, নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহন ছিল কিন্তু শোভিয়েত রাষ্ট্রটি গঠনের পরে নারীদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও ব্যক্তি হিসেবে নারীর প্রকৃত মুক্তি ঘটল না। বৃটিশ শাসনামলে ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়সহ অনেকে নারীদের নিয়ে ভেবেছেন, কাজ করেছেন। নারীর পক্ষে দুই একটি আইনও হয়েছে কিন্তু বৃটিশবিরোধী আন্দোলন যারা করেছেন তারাও নারীর মুক্তির ভাবনাটি সীমাবদ্ধ রেখেছেন ভদ্র ও শিক্ষিত নারীদের মধ্যে। পরবর্তী সময়ে বেগম রোকেয়াকে আমরা পেয়েছি নারীমুক্তির পথিকৃৎ হিসেবে। যদিও তিনি আমাদের এমন অনেককিছু শিখিয়েছেন যা সমাজে ছিল না কিন্তু তিনিও সমস্ত  প্রথা ভাঙতে পারেননি।

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আমাদের নারীজাগরণ খুব উল্লেখযোগ্য ছিল। নারীদের অংশগ্রহণ ছিল দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীতে আমরা কেবল বীরাঙ্গনা উপাধিটিই পেয়েছি, এই উপাধির সম্মান, মর্যাদা, আশ্রয় কোনটিই পাইনি, বরং তাঁদের ভাগ্যে জুটেছে চরম অসম্মান ও লাঞ্ছনা-বঞ্চনা। আমরা ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু নারীর মুক্তি আসেনি। অর্থাৎ, বিভিন্ন বিপ্লব ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সীমাবদ্ধতা থেকে আমরা এই শিক্ষণীয় দিকগুলো পেয়েছি যে, এখানেও প্রতীয়মান হয়, নারীমুক্তির বিষয়টি আলাদা করে ভাবার দরকার আছে।

শিরীন হক বলেন, নারীর নিজের জীবনের ঘটনা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, বঞ্চনা, অত্যচার-নির্যাতন, নিপীড়নের কথা নিজেই নিজের মতো করে বলার জায়গা ও সুযোগ পাবে, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়তে নেতৃত্ব দিবে, অভিভাবকনির্ভর আন্দোলন করবে না- এই চিন্তা থেকে নারীপক্ষর সৃষ্টি এবং ধারাবাহিক আন্দোলন ও সংগ্রাম। নারীপক্ষ কেবলমাত্র নারীর বিষয়েই নয়, অনেক জাতীয় ইস্যুতেও উল্লেখযোগ্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, যেমন: রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার বিরুদ্ধে আন্দোলন ও আদালতে মামলা করা, মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, ইত্যাদি। নারীপক্ষ সরকারের নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে, আইন প্রণয়ন ও বস্তবায়নকে প্রভাবিত করেছে। যদিও এই পথে অনেক বাধা-বিপত্তি এসেছে, এমনকি নারীপক্ষ নামটি নিয়েও অনেক তিরস্কার শুনতে হয়েছে কিন্তু কোনকিছুই অ্মাদের থামাতে পারেনি, দমাতে পারেনি।
শিরীন হক আরো বলেন, শুরুতেই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, নারীপক্ষ একটি স্বতন্ত্র নারীসংগঠন হিসেবে দাঁড়াবে। নারীপক্ষ কোন রাজনৈতিক দলের অংশ হবে না কিন্তু রাজনীতির প্রশ্নে অবস্থান থাকবে, রাজনীতি সচেতন হবে।
মাহবুবা মাহমুদ লীনা বলেন, নারীপক্ষর চিন্তাভাবনা ও আন্দোলনকে সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে ১৯৯৫ সালে জয়দেবপুরে ৬৪ জেলা থেকে আগত স্থানীয় নারীনেত্রীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নারীপক্ষর নেতৃত্বে গঠিত হয় দুর্বার নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক মূলত নারীর উপর সহিংসতা এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন- এই দুইটি বিষয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এখন এমন একটি সময় যখন নারীর নেতৃত্ব বিকাশের বিষয়গুলো খুব বিবেচনার সাথে নিতে হবে। নেতা বদলাবে কিন্তু নেতৃত্ব বদলাবে না- এই নীতিতে আগামীদিনের এজেন্ডা তৈরি করতে হবে। এজেন্ডার উপাত্ত আসবে নিজ জীবন থেকে কিন্তু এজেন্ডা তৈরি করতে হবে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আগত নতুন নতুন মুখগুলোকে নেতা হিসেবে তৈরি করতে হবে, তাদেরকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জায়গা করে দিতে হবে।
মাহবুবা মাহমুদ তার নিজের লেখা একটি কবিতার দুটি লাইন দিয়ে শেষ করেন,
ডাক শোন যুদ্ধের মানবের মুক্তির,
বিপ্লব এবারের বেঁচে থাকা যুক্তির।
দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সহিংসতামুক্ত নারীর জীবন বিষয়ে একইসাথে ৫টি সমান্তরাল অধিবেশন হয়, এই অধিবেশনগুলোর আলোচনা থেকে যে প্রধান বিষয়টি উঠে আসে তা হলো, যুব সমাজকে সহিংসতা প্রতিরোধে যুক্ত করতে বৈবাহিক সম্পর্কে যৌননির্যাতনকে স্বীকৃতি দিতে হবে। সহিংসতা নির্মূলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার প্রবণতা রোধ করতে হবে, যেমন : কখনো পুন:র্বাসনের নামে পরিবারের কণ্ঠ রোধ করা, যাতে করে বিচার প্রক্রিয়া সেখানে থেমে যায়।
এর পরবর্তী অধিবেশনে নারীর শরীর ও স্বাস্থ্য বিষয়ে একইসাথে চারটি সমান্তরাল অধিবেশন হয়। এই অধিবেশনগুলোর আলোচনা থেকে যে প্রধান বিষয়টি উঠে আসে তাহলো, নারীর জীবনে যৌনতা ও অধিকার সম্পর্কে নারী সংগঠনের সাথে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরী করতে হবে। যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত আওয়াজ তুলার সময় এখনই। এই আন্দোলনে সকল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ হতে হবে। যেমন: পাহাড়ের নারী, সমতলের নারী, ভিন্ন মতাদর্শের নারী, ভিন্ন যৌন পরিচয়ের নারী।
সম্মেলনের সমাপ্তী পর্বে উপরোক্ত অধিবেশন সমূহের আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। এই আলোচনা থেকে একটি দাবী উঠে আসে যে, নারীর জন্য অধিকার ভিত্তিক মানসম্বমত ও অবিরাম স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে সম্মেলন আয়োজনের সমন্বয়ক নারীপক্ষর নির্বাহী সদস্য রীতা দাশ রায় এবং ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ক ও নির্বাহী সদস্য নাজমা বেগম সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।